পাশ্চাত্য চিন্তাবিদ জ্যাক রুশোর জীবন দর্শন ও শিক্ষা পদ্ধতি
আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে যত বৈপ্লবিক চিন্তানায়ক এর আবির্ভাব ঘটেছে আধুনিক শিক্ষার জনক রুশো তাদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ। ফরাসি বিপ্লবের সঙ্গে তার নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রাষ্ট্র ও জনগণের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন ব্যাখ্যা তিনি দিয়েছিলেন তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা দিয়েছিল ফরাসি বিপ্লব ও আমেরিকার স্বাধীনতা সংগ্রাম। দরিদ্র, নিপীড়িত মানুষের দুঃখ-দুর্দশা, তাদের উপর সমাজের অবিচার ও তাদের অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার হয়েছিলেন। এগুলি দূর করার জন্য তিনি সংগ্রাম চালিয়ে গিয়েছিলেন তার লেখনীর মাধ্যমে। স্বাধীনতা ও সাম্য মৈত্রীর যে আদর্শ তিনি তুলে ধরেছেন তার উপরই আজকের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।
নেপোলিয়ন বলেছিলেন রুশো ছাড়া ফরাসি বিপ্লব সম্ভব
হতো না। সবচেয়ে বড় কথা হল প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রূটিগুলি যা তার সংবেদনশীল
মনকে নাড়া দিয়েছিল। তিনি তার তীব্র সমালোচনা করেন ও শিক্ষাক্ষেত্রে সম্পূর্ণ
বৈপ্লবিক ধ্যানধারণা সূত্রপাত করেন। তার যুগে আদৃত না হলেও পরবর্তী যুগের
শিক্ষাবিদগণ এর মধ্যে অমূল্য রত্নেের সনধান পান ও সেগুলিকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার
প্রচেষ্টা চালিয়ে নব দিগন্তের সূচনা করেন। অসাধারণ প্রতিভা গভীর অন্তর্দৃষ্টি
তীব্র অনুভূতি ও বলিষ্ঠ লেখনীর অধিকারী হয়েও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তিনি অনিন্ত্রিত প্রক্ষব দ্বারাই পরিচালিত হয়েছেন। তাঁর রচনায় অসামঞ্জস্যতা ও আক্তবিরোধিতা ছিল প্রকট। প্রচলিত সব কিছুর উপর ছিল তার তীব্র রাগ।
রুশোর জীবন দর্শন(Rousseau Philosophy of Life)
1712 খ্রিস্টাব্দে তিনি জেনেভা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে
এক নব যুগের সূত্রপাত ঘটান। মানব জীবনের বৌধিক কার্যাবলীর প্রতিটি শাখায় যেমন- রাজনীতি, ধর্ম, সাহিত্য এবং শিক্ষা এককথায় সমগ্র আধুনিক যুগ রুশোর সঙ্গে আরম্ভ হয়েছে। তিনি
হলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি সেই সময়কার জ্বলন্ত সমস্যাবলি উপলব্ধি করেন খুব গভীরভাবে
চিন্তা করেন এবং একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে উপনীত হতে কাজ করেন। মানুষ্যসমাজের প্রকৃতির
উপর তার তীব্র ঘৃণা তাকে প্রকৃতির দিকে মুখ ফেরাতে বাধ্য করে। সেখানে
তিনি প্রশান্তি ও আনন্দের সন্ধান পেলেন। তিনি ধীরে ধীরে প্রকৃতির মুগ্ধ উপাসক হয়ে উঠলেন। তার সারা
জীবনব্যাপী অভিজ্ঞতা ও দারিদ্র্যের নিষ্ঠুরতা তাকে মৃত মানবতার একজন অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ
সংগ্রামী নায়ক এ পরিণত করে। রুশো র মতে everything is good as it comes from of author
of nature, but everything degenerates in the hands of tha man অর্থাৎ
প্রকৃতির সৃষ্টি শুভ ও সুন্দর মানুষের কৃত্রিম স্পর্শ ঘটায় যত কিছু বিকার। রুশো ছিলেন প্রকৃতিবাদী ভাববাদী দার্শনিক। তিনি প্রকৃতির শক্তি তে বিশ্বাসী ছিলেন
বাইবেলে বলা হয় মানুষ স্বভাবত দুষ্ট। কিন্তু তিনি তার বিপরীত কথা বলেছেন মানুষ স্বভাবত সৎ, সমাজের
কৃত্রিম প্রথা তাকে বিনষ্ট করে। তাই তার উপদেশ হল স্বভাবে প্রত্যাবর্তন।
রুশোর শিক্ষা দর্শন(Rousseau Philosophy of Education)
রুশোর শিক্ষা দর্শনের মূল সূত্রটি তার বিখ্যাত এমিল
গ্রন্থের প্রকাশ পেয়েছে এখানে তিনি তার শিক্ষাদর্শ, পদ্ধতি প্রভৃতি সম্পর্কে
সবিস্তারে আলোচনা করেছেন।
রুশো প্রাকৃতিক সমাজের মানুষের নাগরিকত্বের কথা বলেছেন। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেছেন Man is born free and everywhere he is in
chains imposed by the society গতানুগতিক শিক্ষা পদ্ধতি যা সমাজ দ্বারা
নিয়ন্ত্রিত তা মানুষকে ক্রীতদাস করে তোলে। এই ইতিবাচক শিক্ষা পদ্ধতি কে তিনি ঘৃণার
সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করে নেতিবাচক শিক্ষা প্রবর্তন করতে চেয়েছিলেন। শিশু একটি
স্বাধীন সত্তা যাকে শিক্ষা সাহায্য করবে পরিপূর্ণতা লাভ করতে। শিক্ষার জন্য শিশু নয়
শিশুর জন্য শিক্ষা।
রুশো প্রচলিত শিক্ষা কে তীব্র নিন্দা করেছেন। এই
শিক্ষা নিতান্ত কৃত্রিম পুস্তক ভারে জর্জরিত, আনন্দহীন, কৌতূহলের উন্মেষ বা
ব্যক্তিত্ব বিকাশের কোনো চেষ্টাই করে না। তিনি বলেছিলেন শিশুর শিক্ষা হবে তার
প্রকৃতি অনুযায়ী। তাকে মুক্ত স্বাধীন প্রাকৃতিক পরিবেশ ও নিজের প্রবৃত্তি ও প্রকৃতি
অনুযায়ী বেড়ে উঠতে দিতে হবে। সার্বিক শিক্ষার প্রভাবে তার মানসিক শারীরিক নৈতিক
শিক্ষা হবে এর মধ্যে কোন অভ্যাস গঠন করার প্রয়োজন নেই।
রুশো প্রকৃতি শব্দটি তিনটি অর্থে ব্যবহার কোরেছেন। এগুলি নিম্নরূপ
মনস্তাত্বিক প্রকৃতি ও শিক্ষা(Paychological Nature and Education)
রুশো তাঁর প্রকৃতিবাদে শিশুর মানসিক বৈশিষ্ট্যের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, শিশুর শিক্ষা হবে তার জন্মগত প্রকৃতি, অর্থাৎ তার প্রবৃত্তি, চাহিদা, ইচ্ছা, প্রক্ষোভ ও অনুরাগ অনুযায়ী। এখানে প্রকৃতি বলতে তিনি মনোপ্রকৃতিকেই বুঝিয়েছেন।
জীবনতত্ত্বমূলক প্রকৃতি ও শিক্ষা (Biological Nature and Education)
রুশো বলেছেন, সমাজ সৃষ্টির পূর্বে প্রকৃতির রাজ্যে মানুষ বসবাস করতো। তখন মানুষ ছিল সামাজিক প্রভাবমুক্ত। রুশোর মতে, শিশু তার জৈবিক সত্তার নিয়ম অনুযায়ী প্রকৃতির রাজ্যে যেমন ভাবে বিকাশ লাভ করতো, ঠিক তেমনি ভাবেই বর্তমানে বিকাশ লাভ করবে। সে তার জৈবিক চাহিদার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে, সামাজিক প্ৰভাৱ দ্বারা নয়। এইজন্য শিশুকে সমাজ পরিবেশ থেকে সরিয়ে এনে পপ্রাকৃতিক অবস্থার মধ্যে রাখতে হবে।
জাগতিক প্রকৃতি ও শিক্ষা (Physical Nature and Education)
রুশো বলেছেন শিক্ষার জন্য প্রাকৃতিক পরিবেশকে শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচনা করেছেন। শহুরে জীবনের মধ্যে প্রকৃতির সঙ্গে যোগাযোগ কম, তাই শিক্ষার জন্য তিনি পল্লী পরিবেশেকে উপযুক্ত স্থান বলে বিবেচনা করেছেন। তিনি বলেছেন উপুযুক্ত শিক্ষা দিতে হলে বিশ্বপ্রকৃতির সঙ্গে অবাধ মেলামেশার সুযোগ দিতে হবে। গাছপালা, নদনদী, পশু পাখি ইত্যাদির সঙ্গে প্রতক্ষ পরিচয়ের মাধ্যমে সে তার অভিজ্ঞতা অর্জন করবে সেটাই হবে তার শিক্ষার প্রথমিক ধাপ।
রুশোর নেতিবাচক শিক্ষা (Negative Education)
রুশোর
মতে শিক্ষার দুই প্রকারের ইতিবাচক শিক্ষা এবং নেতিবাচক শিক্ষা| তিনি প্রচলিত
শিক্ষার নাম দিয়েছেন ইতিবাচক শিক্ষ। ইতিবাচক শিক্ষা প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন এটি
অসময়ে পরিণত মন কে সংগঠিত করার প্রয়াস নয়। শিশুকে কতগুলি কর্তব্যের শিক্ষা
প্রদান করে। নেতিবাচক শিক্ষার ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন যে শিক্ষা প্রত্যক্ষ
ভাবে জ্ঞান প্রদানের পূর্বে শিশুর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ
পরিস্ফুট করতে চেষ্টা করে। অর্থাৎ শিশু তাত্ত্বিক জ্ঞান প্রথমে লাভ না
করলেও তা আহরণ করার জন্য উপযোগী হবে।এই
শিক্ষা কালে সরাসরি সদ গুণ অর্জন না করলেও মন্দ গুণ থেকে দূরে থাকবে এই শিক্ষা
শিশুর মনে সত্য সঞ্চার করেনা বটে মিথ্যা থেকে দূরে রাখে।এই শিক্ষা সত্যকে চেনায় ও
ভালোবাসার ক্ষমতা লাভে সাহায্য করে। এতে তাকে সর্বাঙ্গিক স্বাধীনতা দেয়া হয়
শিক্ষক পিতা-মাতা অভিভাবক সভার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকে।
রুশ নেতিবাচক শিক্ষা প্রসঙ্গে বলেছেন A negatieve education does not mean tha time of idleness, far from it.
It does not give virus of it, protects from rice, it does not include truth, it
preserves from going astray.
রুশ র
নেতিবাচক শিক্ষার সহজ অর্থ হলো
(ক) মুক্ত প্রকৃতির মধ্যে শিশুর খেলাধুলার
সুযোগ সৃষ্টি করে হালকা পোশাক এবং সাধারণ খাদ্য সরবরাহ করে তার শরীর শিক্ষার
ব্যবস্থা করতে হবে
পাশ্চাত্য চিন্তাবিদ জ্যাক রুশোর জীবন দর্শন ও শিক্ষা পদ্ধতি
Reviewed by Unknown
on
October 08, 2018
Rating:
Reviewed by Unknown
on
October 08, 2018
Rating:


No comments